৬ কোটি টাকার জব্দ ভারতীয় পণ্য উধাও

মিথ্যা ঘোষণায় ভারত থেকে আমদানি করা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের জব্দকৃত ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, বেবিওয়্যার ও প্রসাধনী সামগ্রী বেনাপোল স্থলবন্দরের জিম্মা থেকে রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে। শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে কাস্টমসের জব্দ করা চালান থেকে দামি পণ্য সরিয়ে সেখানে নিম্নমানের দেশীয় পণ্য রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কুরবানির ঈদের ছুটির মধ্যে বন্দরের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় বন্দরজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

কাস্টমস সূত্র জানায়, যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সাফা ইমপেক্স’ গত ১২ মার্চ ভারত থেকে একটি চালান আমদানি করে। সিএন্ডএফ এজেন্ট হিসেবে চালানটি গ্রহণ করে মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজ। আমদানি নথিতে বেকিং পাউডার ঘোষণা করা হলেও কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষায় ১০৮ কাটনে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, বেবিওয়্যার, ফেসওয়াশ, ক্রিম, লোশনসহ বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী পাওয়া যায়।

কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, এসব পণ্য মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে আমদানি করে ২ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ৫১৫ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালের কাস্টমস আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় চালানটি জব্দ করে বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের জিম্মায় রাখা হয় এবং আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত খালাস না দিতে একাধিকবার লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, গত ১২ মার্চ, ২ এপ্রিল ও ২০ মে পৃথক তিনটি চিঠির মাধ্যমে চালানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু ঈদের ছুটির মধ্যে তালাবদ্ধ ৩৭ নম্বর শেডে রাখা জব্দকৃত পণ্য সরিয়ে সেখানে দেশীয় নিম্নমানের পণ্য রাখা হয়।

অভিযোগের ভিত্তিতে শুল্ক গোয়েন্দারা অনুসন্ধান শুরু করলে গত ২ জুন বন্দর ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে চালানটি পুনরায় পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বেনাপোল কাস্টমস হাউজের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, “আমদানিকৃত ভারতীয় পণ্যের পরিবর্তে যে দেশীয় পণ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো বসুন্ধরা ও মেঘনা শিল্প গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম মুদ্রিত কাটনে রাখা ছিল। এছাড়া দেশীয় সংবাদপত্রে মোড়ানো এবং বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের স্টিকারযুক্ত পিপি বস্তাও পাওয়া গেছে। এসব আলামত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, পণ্যগুলো দেশের অভ্যন্তর থেকেই সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, বন্দরের অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া তালাবদ্ধ শেড থেকে কয়েক কোটি টাকার পণ্য সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

ঘটনার পর গত ৩ জুন কাস্টমস হাউজ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, কাস্টমস আইনের বিধান অনুযায়ী জব্দকৃত পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ওয়্যারহাউজ রক্ষকের। জিম্মায় থাকা অবস্থায় পণ্য পরিবর্তন ও সরিয়ে ফেলার ঘটনায় কাস্টমস আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ২ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ৫১৫ টাকার রাজস্ব বন্দর কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করতে হবে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) মো. শামীম হোসেন বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। শেড ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহজালালকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মো. রুহুল আমিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।”

অন্যদিকে সিএন্ডএফ এজেন্ট মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান দাবি করেন, জব্দ হওয়া চালানটির খালাসের জন্য তাদের প্রতিষ্ঠান কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। রাজু নামের এক ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং তার পরিচয় কাস্টমসকে জানানো হয়েছে।

সূত্র জানায়, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সাফা ইমপেক্স’-এর মালিকানা কাগজে-কলমে একজন নারীর নামে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আমদানি পণ্য জালিয়াতি ও শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় আলোচিত ব্যবসায়ী আশরাফ হোসেন ওরফে বাবু। তবে তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রথমে মিথ্যা ঘোষণায় বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়। পরে চালানটি জব্দ হওয়ার পর বন্দরের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই পণ্য সরিয়ে ফেলে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করা হয়েছে। পুরো ঘটনায় সংঘবদ্ধ একটি চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে।