
মো. আবুল খায়ের খান (মাদারীপুর), শিবচর: মাদারীপুরের শিবচরে জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে সরকারি জমি নিজের নামে মিউটেশন (নামজারি) করার চেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কোটি টাকা ঘুষের প্রলোভন দেওয়ার অভিযোগে একটি প্রতারক চক্রের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
জানা গেছে, শিবচর পৌরসভার গুয়াতলা এলাকার মৃত কুটিশ্বরেশ্বরীর পুত্র শ্রী পলাশ চন্দ্র দাস ৭১ নম্বর কেরানীরবাট মৌজার এসএ ৮১, ৮২, ৯৪, ১৩১, ১৪৯, ১৬১ ও ১৮২ নম্বর খতিয়ান এবং এসএ ৯৪, ৯৫, ১০৪, ১৪২, ১৫৫, ১৬৮ ও ১৮৮ নম্বর দাগভুক্ত মোট ২৩১ শতাংশ জমি নিজের নামে নামজারি করার জন্য ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর শিবচর পৌর ভূমি অফিসে আবেদন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি ১৯৬১ সালের ৬৬৬৮ নম্বর একটি ভুয়া দলিল, জাল স্বাক্ষরযুক্ত এসএ ও আরএস পর্চা এবং নিজের মতো করে তৈরি করা জাল কাগজপত্র দাখিল করেন। দলিলে ক্ষেত্রমোহন, শীতানাথ ও রাখাল চন্দ্র সাহাকে দলিলদাতা হিসেবে দেখিয়ে বণ্টন মামলার ভুয়া রায়ও তৈরি করা হয়। এছাড়া প্রিয়লালের নামে একটি জাল সার্টিফায়েড কপিও জমা দেওয়া হয়। এতে ২০০৫ সালের একজন কর্মকর্তার স্বাক্ষর দেখানো হলেও অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই কর্মকর্তার চাকরি শুরু হয় ২০১০ সালে।
চক্রটির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পর পলাশ চন্দ্র দাস পুনরায় ২০২৬ সালের ১৭ মে ৪১১ শতাংশ জমি নামজারির জন্য আবেদন করেন। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় প্রতারক চক্রটি শিবচর পৌর ভূমি কর্মকর্তা (তহসিলদার) সাহাদাত হোসেনকে এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।
এরপর ভূমি কর্মকর্তা সাহাদাত হোসেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করেন। প্রকৃত মালিকানা যাচাই করে তিনি দেখতে পান, সংশ্লিষ্ট জমিটি অনেক আগেই বাংলাদেশ সরকারের অনুকূলে ১/১(খ) তফসিলভুক্ত হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পলাশ চন্দ্র দাসের সঙ্গে আরও চারজন যুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মিরপুর বিআরটিএর এক কম্পিউটার অপারেটর সুবাস, ঝিনাইদহের রাসেল এবং সাভারের এক ছাত্রনেতা। তারা সবাই মিলে জমির মিউটেশন করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তহসিলদারকে এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
বিষয়টি তহসিলদার সাহাদাত হোসেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইখা সুলতানাকে অবহিত করলে তিনি আবেদনকারীকে সব কাগজপত্রসহ শুনানিতে তলব করেন। দাখিল করা কাগজপত্র যাচাই করে তিনি দেখতে পান, প্রতারক চক্রের জমা দেওয়া সব নথিই ভুয়া ও জাল।
পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজানকে অবহিত করলে তিনি পলাশ চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। পলাশ চন্দ্র দাস ও তার ভাই ওয়াসিম চন্দ্র দাসকে আসামি করে শিবচর থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। এদিকে পলাশ চন্দ্র দাস বর্তমানে শিবচর থানা হাজতে রয়েছেন।
এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইখা সুলতানা বলেন, “সরকারি জমি জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে দখল বা নামজারি করার অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। এ ধরনের অপরাধে জড়িত অন্য সদস্যদেরও শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কোটি টাকার প্রলোভন দেখিয়ে সরকারি জমি মিউটেশন ও জালিয়াতির অভিযোগে পলাশ চন্দ্র দাসকে আটক করে শিবচর থানায় পাঠানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভূমি জালিয়াতি ও জাল কাগজপত্র তৈরির অভিযোগে মামলা করা হবে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পলাশ চন্দ্র দাসের পূর্বপুরুষরা অনেক আগেই শিবচর ছেড়ে চলে যান। তার ভাষ্যমতে, তিনি বর্তমানে ঢাকার গাবতলীতে ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি দাবি করেন, স্টুডিও ব্যবসা, শুটিং, বিয়ে-অনুষ্ঠানে ভিডিও ধারণ এবং নাটক নির্মাণের কাজ করেন। তার মোবাইল ফোনে থাকা বিভিন্ন তথ্য ও যোগাযোগের সূত্র ধরে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।















