মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬২২, আহত ১ হাজার ৬৫২ : যাত্রী কল্যাণ সমিতি

গত মে মাসে দেশে ৬১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২২ জন নিহত এবং ১ হাজার ৬৫২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একই সময়ে রেলপথে ৪২টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত ও ২৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া নৌপথে ২১টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত, ১৫ জন আহত এবং সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন।

শনিবার (১৩ জুন) সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে সংগঠনের দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সংগঠনটির দাবি, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না পাওয়া অনেক দুর্ঘটনার তথ্য এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৬৭৬টি দুর্ঘটনায় ৬৭১ জন নিহত এবং ১ হাজার ৬৯৬ জন আহত হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ২২১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৩১ জন নিহত ও ২১৯ জন আহত হয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ১৮০টি দুর্ঘটনায় ১৮৫ জন নিহত ও ৫৫৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে, যেখানে ২৭টি দুর্ঘটনায় ৩৮ জন নিহত ও ৬৭ জন আহত হয়েছেন।

সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের মধ্যে ১৩৯ জন চালক, ১২১ জন পথচারী, ১১৩ জন পরিবহন শ্রমিক, ৯৬ জন শিক্ষার্থী, ৯৩ জন নারী এবং ৬৮ জন শিশুর পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ১৩৬ জন চালক, ১১০ জন পথচারী, ৭৩ জন শিক্ষার্থী, ৬৯ জন নারী, ৫৯ জন শিশু এবং ৪৯ জন পরিবহন শ্রমিক রয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনায় জড়িত ৯৭৫টি যানবাহনের মধ্যে ২৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২৩ দশমিক ১০ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান ও লরি, ১৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ বাস, ১২ দশমিক ৯৭ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক এবং ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছিল।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, পর্যাপ্ত রোড সাইন, রোড মার্কিং ও সড়কবাতির অভাবে ফিডার সড়ক থেকে হঠাৎ যানবাহনের মহাসড়কে উঠে আসা, সড়কে মিডিয়ান বা ডিভাইডারের অভাব এবং গাছপালার কারণে অন্ধবাঁকের সৃষ্টি। এছাড়া মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টোপথে চলাচল, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া ও বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালানো, বৃষ্টির কারণে সড়কে গর্ত সৃষ্টি এবং ভাঙাচোরা সড়কও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে নিম্নআয়ের মানুষ বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের ছাদে যাতায়াত করতে বাধ্য হওয়ায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে সংগঠনটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তাদের মতে, উন্নত বিশ্বের আদলে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা চালু করা, চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা ও লাইসেন্স নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সার্ভিস লেন, ফুটপাত ও নিরাপদ পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও নিয়মিত রোড সেফটি অডিট, ফিটনেস সনদ প্রদানের পদ্ধতি আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন অপসারণ, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া পরিবহন খাতে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।