কাস্টমস পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটে রাজস্ব ফাঁকির ‘গোপন সিন্ডিকেট’! বহিরাগত ও সিপাইয়ের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

মানিকগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীসহ সাভার ও মানিকগঞ্জ অঞ্চলের একাধিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিপুল রাজস্ব ফাঁকির পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য-একজন বহিরাগত ব্যক্তি ও কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট পশ্চিম কমিশনারেটের এক সিপাই গোপনে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট ও রাজস্ব নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বহিরাগত মোঃ সুজন মোল্লা এবং সিপাই আব্দুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে মানিকগঞ্জ বিভাগ, শিবালয় সার্কেল, মানিকগঞ্জ সার্কেল ও সাভার বিভাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপন সমন্বয় করে সরকারের প্রকৃত রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি করছেন। অভিযোগ রয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান কত টাকা ভ্যাট দেবে এবং কত রাজস্ব নির্ধারণ হবে, সেই হিসাবও তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ধারিত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মোঃ সুজন মোল্লা নিয়মিতভাবে মানিকগঞ্জ ভ্যাট বিভাগে বসে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং বিভাগ-সংশ্লিষ্ট নানা সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়ে প্রভাব বিস্তার করেন। একজন বহিরাগত হয়েও তার এমন সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ী মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি মানিকগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত মেসার্স মারুফ এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি সামনে আসে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটের সৎ ও দক্ষ কমিশনার কাজী ফরিদ উদ্দিনের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটির কাগজপত্র ও হিসাব-নিকাশ জব্দ করা হয়। তবে তদন্ত চলাকালেই বেরিয়ে আসে আরও বিস্তৃত অনিয়মের তথ্য।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বহিরাগত সুজন মোল্লা মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও ঘুষ বাণিজ্যের কাজ পরিচালনা করেন এবং সিপাই আব্দুর রহমান মাঠপর্যায়ে দিকনির্দেশনা দিয়ে তা বাস্তবায়ন করেন।
তাদের মাধ্যমে বহু প্রতিষ্ঠান কম রাজস্ব দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ী মহলের একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “সুজন মোল্লা মানেই আব্দুর রহমান সিপাই। এই দুজনের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়ে গেছে এবং এখনও যাচ্ছে।”

বিশেষ অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সুজন মোল্লা প্রতি মাসে আউটসোর্সিং কার্যক্রমের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই আয়ের বড় একটি অংশ নিয়মিতভাবে আব্দুর রহমানকে মাসোহারা ও ঘুষ হিসেবে প্রদান করা হয়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, মোঃ সুজন মোল্লা প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে কাস্টমস ও ভ্যাট-সংশ্লিষ্ট মানিকগঞ্জ ভ্যাট বিভাগে কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এই সময়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, আব্দুর রহমানের স্থায়ী ঠিকানা ও ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে বলে দাবি করেছেন অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্টরা। জানা যায়, সিপাই আব্দুর রহমান বর্তমানে পশ্চিম কমিশনারেটে কমিশনার সাহেবের চেম্বার সদর দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন এবং তিনি সাভারে তার শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করেন।

অভিযোগ রয়েছে, কমিশনার কাজী ফরিদ উদ্দিনের নাম ভাঙিয়ে আব্দুর রহমান সিপাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন, যদিও কমিশনার এ বিষয়ে অবগত নন। একাধিক মহল থেকে জানা যায়, সদর দপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রমও তিনি নীরবে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

তবে সংশ্লিষ্ট মহল ও একাধিক ব্যক্তির দাবি, পশ্চিম কমিশনারেটের কমিশনার কাজী ফরিদ উদ্দিনের অজান্তেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। কারণ, সম্প্রতি অনিয়মের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের পরই এসব তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যানের কাছে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, “একজন সিপাই ও একজন বহিরাগত কীভাবে ভ্যাট বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে এত প্রভাব বিস্তার, ঘুষ লেনদেন এবং রাজস্ব নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।”
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।